বাংলা ও বাঙালীর বিপন্নতা: অন্তর্লীন যন্ত্রণার দুয়েকটি কথা | সৌমেন মিটার

🟥 খুব স্বাভাবিক কারণেই আইডেনটিটির বা পরিচিতিসত্তার রাজনীতিতে আমি কখনো বিশ্বাস করিনি। কোনরকম কোনো আইডেনটিটির রাজনীতিতেই না।

কিন্তু, সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনায় আমার মধ্যেকার সেই সুপ্ত প্রাদেশিক আইডেনটিটির বোধ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। চোরবাগানের পুজোর গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাকে এবিপি আনন্দের সাংবাদিক হিন্দীতে প্রশ্ন করছে। সে বাংলা বলতে পারে না? না পারলে, কেনো পারে না? বাংলায় থাকে না? বাঙালীর পুজোয় দাদাগিরি করবে, গায়ের জোর দেখিয়ে পুজোর মাসখানেক আগে কমিটি দখল করবে; অথচ বাংলা বলবে না?

পুজোর আগে দেখছিলাম, কোনো এক প্রমোদ দুবে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উদ্দেশে রণহুঙ্কার দিচ্ছে। সেও কোনো এক পুজো কমিটির নেতা, এবং অবশ্যই শাসক দলের অন্তর্বাসের ভেতরে লুকোনো কেশরাশির কোনো একটি। আনন্দবাজার পত্রিকা অফিসে যারা তাদের পছন্দের রাজনৈতিক রঙ করতে গিয়েছিলো - কারা তারা? একজনও বাঙালী। একজনও ঠিকঠাক করে বাংলা উচ্চারণ করতে পারে? 

পুজোর এই দু'তিন দিনে, নাগেরবাজার, হাওড়া সহ বেশ কয়েকটি যায়গায় যারা বইয়ের স্টল ভ্যান্ডালাইজ করলো, তাদের অনেকের জিভ তো এখনো বাংলা বলার জন্য তৈরীই হয়নি। বংশপরম্পরায় বাংলায় থাকবে, অথচ বাংলা বলতে শিখবে না - তা তো হবে না। ভিডিওতে দেখলাম , নাগেরবাজারে একজন রুস্তম শরৎচন্দ্রের 'পথের দাবী' বইটা তুলে নিয়ে মস্তানি করে বলছে, এখানে কী লিখা আছে? কাশ্মীর আজাদী মাঙ্গে? 

সব মিলিয়ে আমার মধ্যে তোলপাড় চলছে। যার জেরে, আজ এক গরীব বিহারী ভুজিয়াওয়ালাকে বলেই ফেললাম, বাংলায় থাকবে, করে খাবে, আর বাংলাটা বলতে শিখবে না; তা তো হবে না। হয়তো নতুন এসেছে বেচারী, কিন্তু আমার যুক্তিবুদ্ধি এই ব্যাপারে দ্রুতগতিতে লোপ পাচ্ছে। 

সাধারণভাবে আমি হিন্দী বা অন্য কোনো ভাষার বা  ভাষাভাষীর বিরোধী নই। কিন্তু একটি বিশেষ রাজনীতির সাথে হিন্দী সমার্থক হয়ে যাচ্ছে। হিন্দী সাম্রাজ্যবাদের লক্ষণ ক্রমশঃ স্পষ্টতর হচ্ছে। কিছুদিন আগেই, রাজ্যের শাসক দলের রাজ্য সভাপতি মানিকতলার কালোয়ারদের বৈধতা দিতে গিয়ে একটি অনুষ্ঠানে বললেন, ওই জয়সোয়ালদের জন্যই নাকি ১৯৪৬ এ উত্তর কলকাতার বনেদী বাঙ্গালী পরিবারগুলো রক্ষা পেয়েছিলো। যুক্তি কী? না, ওরা ওদের লোহা দিয়ে বাঙালীকে তলোয়ার বানিয়ে দিয়েছিলো। নিজেরা যাদের পে-রোলে, তাদের জন্য কিছু ছেদো যুক্তির অবতারণা করতে হয়, তাই এইসব অদ্ভুতুড়ে তত্ত্বের অবতারণা।

মনে পরছে, একদা 'আজকাল' পত্রিকার সম্পাদক অশোক দাশগুপ্তের তৈরী করা সেই 'নবজাগরণ' নামের সেই সংগঠনটিকে। অনুপ্রাণিত বেশ কিছু বন্ধু সেদিন বাঙালিত্বের নামে বেশ একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলো বলে ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। আজ মনে হচ্ছে, ভুল করেছিলাম।

মনে পরছে, অনেকদিন আগে দেখেছিলাম, একটি জাতীয় ইংরেজী খবরের চ্যানেলে কোনো একজন প্যানেলিস্ট হঠাৎই হিন্দি বলতে শুরু করায়, 'বাংলা পক্ষে'র গর্গ চট্টোপাধ্যায় এমনই বেঁকে বসেছিলেন যে, অ্যাঙ্কর মেয়েটির শত অনুরোধ সত্ত্বেও ওকে টলানো যায়নি। ওই প্যানেলিস্টকে হিন্দীতে বলতে অনুমতি দেওয়ার প্রত্যুত্তরে গর্গ, ইংরেজিতে বলা বন্ধ করে, বাংলা বলেই চলছিলেন। অ্যাঙ্করের অবস্থা নাস্তানাবুদ, শো-টি ভন্ডুল হবার যোগাড়। গর্গকে কিন্তু কোনোভাবেই নড়ানো যায়নি ওর জায়গা থেকে। শো-টিকে বাতিল করতে হয়েছিলো।

কিছু জিনিস নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বোধ হয়। 
🟦

Comments

Popular posts from this blog

The Gandhian Generation: How India’s Gen Z Is Rediscovering the Politics of Truth, Non-Violence and People’s Power | Sowmen Mitter

The Greatest Festivities of Bengal: More a Celebration of Societal Amity and Togetherness than a Religious Event | Sowmen Mitter

🟥 Rabindranath Tagore and His Understanding of Nationalism | Sowmen Mitter